Wednesday, August 12, 2015

সুখী মানুষের সেরা সময় ...

সেই চোদ্দ পনের বছর বয়সের দিনগুলো, যখন ডানাটা গজিয়েছে সবে, যখন এই চেনা বৃত্ত থেকে উড়ে বেরিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে আচ্ছন্ন এই মন। যখন খবরের কাগজে সামান্য কিছু বিজ্ঞাপন। সেই সময়টাই তো সেরা সময়, আমার সময়, সেই সময়ের গান, সেই সময়ের সিনেমা, সেই সময়ের কবিতা, সেই সময়ের রিক্সাওয়ালা, দোকানদার, কন্ডাকটার, সেই সময়ের আকাশ, সেই সময়ের বৃষ্টি, সেই সময়ের গরম, সেই সময়ের আম, সেই সময়ের ইলিশ, সেই সময়ের অষ্টমী, সেই সময়ের কালিপটকা। প্রথম সমুদ্র দেখা কিশোর ছেলেটার মুখ হা হয়ে আছে। বালির উপর প্রথমবার লিখছে নিজের নয়, নিজের প্রেমিকার নাম। সেইটাই তো সেরা সময়। ফিরতে হলে সেখানেই ফিরব।

একটাই কোনো ছাদের থেকে উড়ছে এ পাড়ার সবক’টা ঘুড়ি। ঘুড়িতে ঘুড়িতে ঢেকে যাচ্ছে আকাশ।সাদা ধবধবে কাগজে কারো হাতের লেখায় নিজের নাম। সাথে লালকালীতে করা কারুকাজ। বুকপকেটের কুঠুরীতে বহুদিন সযত্নে  তুলে রাখা ছিল সেই সম্পদ। তারপর কাগজের গুড়ো একদিন উড়ে যায় বসন্তের হাওয়ায় আহা সে কি সময় ছিল। স্কুলের টিফিনে বারান্দা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া এরোপ্লেন। জানলা দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া কাগজের নৌকো। ছুটে এসে রাস্তায় পড়ে থাকা জলের বোতলে ফুটবলের শট। ঘরের দেওয়ালে শচীনের ফটো, তাতে সঙ্কেতে লিখে রাখা কারো নাম। ডায়রীর শেষ পাতায় টুকে রাখা পাশের বাড়ির ফোন নম্বর। খবরের চ্যানেলের লোগোতে নয়, মনে মনে হিসেব রাখা পুজো আসতে আর মাত্র বাকি ১৯ দিন। বয়স যখন ১৫, অথবা ১৬, কারো কারো হয়ত ১৭। লুকিয়ে সিগারেট। দুপুরে কারো ফাঁকা বাড়িতে চাঁদা তুলে ভাড়া করে আনা ভিসিআরে পর্ণোগ্রাফি।

ছাদের কোণায় দাঁড়িয়ে লুকিয়ে দেখা বহু দূরের কোনো বাড়ির ছাদে কাপড় মেলতে আসা মেয়েটিকে। বিকেল বেলায় রেলগেটের সামনে আসতে পারবে ? তুমি এলে না। কেন এলে না? এলে দেখিয়ে দিতাম প্রেম কাকে বলে? এই যে দুপুরবেলায় একঘেঁয়ে সিরিয়ালে ডুব দিয়েছ, সত্যি করে বলো তো, খুব কি সুখে আছ? সেদিন তোমায় নিয়ে পালিয়ে যেতাম ঠিক। স্বপ্নের দেশে। আমার তখন ১৭, তোমার সামনে মাধ্যমিক। এখন মধ্যবয়সের দোরগোড়ায় স্মৃতীতে নস্টালজিক।

ঝাঁ চকচকে শপিং মলের পাশে পলেস্তারা খসা বাড়িটা আমার। জানলার গ্রীলে মরচে। মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়ামে দেওয়া গেল না। ছোট ছেলেটা বখাটে হয়েছে। বদমেজাজী স্বামী। খিটখিটে বউ। সব সুন্দরী মেয়েরা বাইকের পিছনে বসে চলে গেছে ন্যাশানাল হাইওয়ে ধরে বহুদূর। সব স্বপ্নের চাকরী বাগিয়ে নিয়েছে প্রতিবেশীরা। ফাটকা ব্যাবসায় বহু মাল কামিয়েছে দত্তবাড়ি। বেড়ার বাড়ি আজ মার্বেল বসানো। পরিবর্তনে গা ভাসিয়ে কেউ জুটিয়েছে স্কুলের শিক্ষকতা, কেউ কেউ পৌরসভার কন্ডাকটরি। বাজি লড়ে সে সময় সাইকেল নিয়ে চক্কর মেরেছিলাম বড় স্কুল মাঠে না থেমে ১০১ পাক। এখন বাজারে ঘুরে মরি সবচেয়ে সস্তার দোকান খুঁজে পেতে। বড়লোকে খরচা করে, গরীবরা হিসেব করে। রাতে খাওয়ার টেবিলে স্বামী স্ত্রী স্বপ্ন দেখে যদি হঠাৎ করে কিছু লাখ টাকা লটারী পাওয়া যায় তো কি কি করবে?

গালাগালি দিই এই সময়কে। কি আছে এখন ? আমার সময়ের মত লাল শাক নেই, বুঝলেন ফুটবল খেলে ফিরছি, গলগল  করে রক্ত পড়ছে গোড়ালি ফেটে, একটুখানি বোরোলিন লাগাতেই পাঁচ মিনিটে রক্ত পড়া বন্ধ, দু ঘন্টায় সব শুকিয়ে সাফ, এখন তো সেটাও নেই। সবেতেই ভেজাল। গোলাপে গন্ধ নেই, শাঁসওয়ালা ডাব নেই, একটু বড় সাইজের ডিমওয়ালা ট্যাংরা মাছ নেই। এই যে বর্তমান সময়কে নিন্দে, এই যে নিজের সময় নিয়ে আত্মশ্লাঘা এছাড়া আমাদের আর কি আছে ? হাত আছে তবে সেটা হাতিয়ার নয়। আমরা বোম ছুঁড়তে পারি না। চোরকে খুঁটিতে বেধে পেটাতে পারি না। কেউ পেটালে বাঁধাও দিতে পারিনা। খবরের কাগজ পড়া বন্ধ করতে পারি শুধু। নিজের রাগ মেটাতে রাতের বেলায় ফুল ফ্যামিলি মিলে এই পোড়া সময়কে তেড়ে খিস্তি করতে পারি শুধু। এই সামান্য সম্বলটুকু আমরা ছাড়ব কেন? নইলে পরেরদিন আবার সেই ভীড় বাসে ট্রেনে ধাক্কা খাওয়ার শক্তি জোগাব কি করে?



ছুটিতে সকলে মিলে বেড়াতে চলেছি পাহাড়ে। রাতের বেলায় অন্ধকার চিঁড়ে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। সকলের ঘুমের মাঝ থেকে আমি উঠে চলে এলাম চলন্ত ট্রেনের দরজায়। দমকা হাওয়া এসে লাগলো মুখে। এক লহমায় চোখের সামনে ভেসে উঠল কালো ছাতাটা। ময়দানের প্রচন্ড বৃষ্টিতে যখন সকলেই আশ্রয় নিয়েছে চায়ের দোকানের শেডের তলায়, গাছের নিচে, বাড়ির বারান্দায়। একটি ছেলে একটি মেয়ে সামান্য একটা ছাতায় ভরসা করে হেঁটে চলেছে বৃষ্টির মধ্যে। সেই বিলম্বিত চুম্বনের শেষে ছেলেটি বাসে উঠে যাবে, মেয়েটি ঢুকে যাবে মেট্রোয়। তারা দুজনে কেউ জানে না এটাই তাদের শেষ দেখা। ব্যাস্ত মোড় এক ছুট্টে পার হয়ে গেল সে। ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষন ক্যাবলার মত দাঁড়িয়ে ফিরে এলাম বাড়িতে। প্রথম দেখা মনে থাকে, শেষ দেখা রয়ে যায় চোখের জলে। আমি কতবার ফিরে গেছি সে রাস্তায়। দাঁড়িয়ে থেকেছি একা। আমি এখনও দেখতে পাই সে চলে যাওয়া। পিছন ফিরে তাকিয়েছিল কি সে? এই ঝাপসা চোখে বোঝা যায় না সঠিক। শহরে হঠাৎ বৃষ্টি নামে, তার ছাঁট এসে লাগে ট্রেনে দাঁড়ানো এক সুখী মানুষের মুখে।

Sunday, August 2, 2015

২২শে শ্রাবণ উপলক্ষ্যে

২৫শে বৈশাখ অথবা ২২শে শ্রাবণ অথবা অশাম শালা অশাম শালা অশাম শালা

..................................................................................................... প্রবীর কুন্ডু



রবীন্দ্রনাথকে বোঝা বড় কঠিন। বাঃ কি দারুণ একখানা লাইন। কোনো টপ লেভেলের চ্যানেলে সাদা পায়জামা পরে সন্ধ্যেবেলার আসরে লাইনটা নির্দ্বিধায় ঝেড়ে দিয়ে কামিয়ে আসা গোঁফে একটু তা দিয়ে দিলাম। ওরে হাঁদারামা শুধু রবীন্দ্রনাথকে নয়, নবান্নের মমতা, পিকুর দীপিকা এমনকি পাঁচমাথার পাঁচুগোপালকে বোঝাও চাট্টিখানি কথা নয়।
‘তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখো ওগো ঘুম ভাঙানিয়া’ ... লাইনটা বুঝলেন তো কোনো প্রেমিকা বা প্রেয়সীকে নিয়ে নয়, ওটা আসলে রাতের বেলায় শান্তিনিকেতনের কোনো এক ঘরে বৃষ্টির সময় চাল ফুটো হয়ে জল পড়ছিল, সেই আনন্দে লেখা। তোমার মাথা !! কবি তোমায় এস এম এস পাঠিয়েছিল ?? কবির মনে কি চলছিল তা তুমি কি করে জানলে হে ছোকরা ‘পয়গম্বাট’।
তোমার নিজের মনের কথা তুমি জানো ?? ট্রেনের জানলায় বসে দূরে দেখলে কি


ছু পাঁজি ছেলে কাঁদা মেখে ফুটবল খেলছে। অমনি তুমি নস্টালজিয়ার পাড়ায় খাবি খেয়ে গুমড়ে উঠলে, আহা রে ‘আকাশ ঘিরে মেঘ করেছে / বাদল গেছে টুটি’ ... উহু উহু। আর নিজের ঘরের ছেলে স্কুল থেকে কাঁদা পায়ে বাড়ি ফিরলে সপাটে চড়, বিকেলে টিফিন বন্ধ। হিপোক্রিটের হিপোপটেমাস।
রবি তার বউদির হাত ধরলে বা তার সাথে লুকোচুরি খেললে পরকিয়া হয়ে যায়। আর তুমি শালা ক্রিয়েটিভের শুঁয়োপোকা তাই নিয়ে বই লেখো, সিনেমা বানাও। টিকিট কেটে ১০০ বছর আগের কাল্পনিক পরকিয়া দেখে নিজেকে শ্বান্তনা দাও, রবীন্দ্রনাথ যদি করতে পারে তাহলে আমি কি দোষ করলুম।
‘আমার হিঁয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে দেখতে তোমায় পাইনি’। পাবে কি করে, চোখে তোমার ছানি ছিল, নয়তো ন্যাবা ছিল। অথবা গার্নিশ করা ত্বক দেখে তোমার মাথায় ভ্যাবাচ্যাকা ছিল। শুধু মুখেই বলেছিলে ‘ডাগর দু’খানি আঁখি’ / তোমার চোখ তখন রিসেপসনিস্টের ক্লিভেজে মাখামাখি।
‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ুরের মত নাচেরে’, কবিসভা জমিয়ে দিলে খানিক নিলে হাততালি। ওদিকে খিস্তি দাও পৌরসভায়, যদি অফিস ফেরতা জমা জলে ভিজে যায় গোড়ালি। ‘কৃষ্ণকলি কৃষ্ণকলি’ বলে অনাবিল দাঁত কেলিয়েছো আর বিজ্ঞাপন দিয়েছ পাত্রী চাই ফর্সা। কুমারীর মন কেড়েছে ‘রাখালিয়া বাঁশিতে’ কিন্তু হাজ্‌বেন্ড চাই কেঃসঃচাঃ এবং বাইক বিনা হেলমেটে।
‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাঁটে’। রবি, তুমি বহুদিন আগেই মরেছ। তবু তোমায় শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না কেউ। উঠতি ব্যান্ড গীটার নিয়ে তোমার জ্বালিয়ে দিচ্ছে সুর, নয়তো বালি মাফিয়ায় তোলপাড় হয়ে গেছে সমগ্র বোলপুর। তুমি এখন ঝালে ঝোলে অম্বলে সিনেমা সিরিয়ালে। ভালোবাসার চাপে তুমি চিপসে গেলে। বাংলার মা বোনেরা তোমায় রোজ গিলছে সাথে খানিক মুড়ি তেলেভাজা। ভিখিরি বাউল বিড়িতে দু’টান দিয়ে বলে , ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে / আগে তো নিয়ে আন তালা / অশাম শালা অশাম শালা অশাম শালা ...
হয়তো এখানেই ‘দাঁড়িয়ে আছো’ ছোট্ট মিনুর হাত ধরে। দেখে নাও ২২শে শ্রাবণ ভীষণ খুশি, ভরে আছে স্পনসরে।

Monday, January 12, 2015

কথা বলতে রাজী তো মামণি। শুধু বল, কবে কোথায় ?

নীলাঞ্জণা দিদিমণি। কোনো এক টিভিতে একদিন বলতে শুনছিলাম VC প্রোমোশান দিচ্ছে না। টাকা পয়সা দিচ্ছে না ইত্যাদি নিয়ে ওনার ক্ষোভ আছে। ক্ষোভের কারণ দেখেই ঝাঁট জ্বলে যায়। যাই হোক তবু নিজে তিনি অনশন করেননি। ছাত্রদের অনশনের 'পাশে' থেকেই প্রোমোশান পাবেন নিশ্চয়ই এবার।

যাদবপুরের যে ছাত্ররা আন্দোলন করল তাদের উৎফুল্ল হতে দেখে ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে না বাকি ৪ দফা দাবীর আর প্রয়োজন আছে। আসল কাজ তো হাসিল। সঠিক জানি না । আর দুদিন পর 'আনন্দ' সরবে, তারপর আন্দোলনের প্রয়োজন ফুরাবে হয়ত।

মানুষের মুখে মুখে এখন সংবাদপত্রের ভাষা শোনা যায়। এই যেমন 'নতি স্বীকার' একটি দারুণ শব্দ। তোমার কথা না মানলে বলবে একটু মানবিকতা দেখাও। মেনে নিলে বলবে 'নতি স্বীকার'। সবকিছুই কিন্তু সঞ্চালিকার চাল নয়, আমাদের গবেট মস্তিস্কের কারণেও বটে।

'প্রতিকী অনশন' নামেও একটা দারুণ জিনিস চালু হয়েছে। বাড়ি থেকে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে আবার বাড়ি ফিরে হাপুস হুপুস খেয়ে নেওয়া। আমি তো প্রায় প্রত্যেক দিন প্রতিকী অনশন করছি সেই গত দশ বছর ধরে।

বিঃদ্রঃ ঝাঁট জিনিসটি ঠিক কি সেটি আমার জানা নেই। শুধু জ্বলছে বোঝা যায়, দেখা যায় না।

Monday, January 5, 2015

আমরা ফিল্ম মেকার নই, আমরা জোগাড়ে।

বিশ্বের কথা বলতে পারব না। ভারতের কথাও জানা নেই। মোটামুটি ভাবে এই কলকাতার ছেলেদের কথা বলতে পারি। ছেলে বলতে শুধু ছেলে নয়। মেয়েরাও আরকি!! তবে তারা সব শুধু ছেলে মেয়ে নয়। কেউ কেউ বুড়োও আছেন তাতে। মানে বলতে চাইছি এই কলকাতায় বা কলকাতার আশেপাশে যারা নিজেদের মত করে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় সিনেমা বা ডকুমেন্টারি বা ঐ জাতীয় কিছু একটা করছেন বা করতে চাইছেন । হ্যাঁ তাদের কথা বলতে পারি।

না, এমনটা নয় যে তাদের সাথে বিশাল আলোচনা ফালোচনা করেছি। নাওয়া খাওয়া ভুলে তাদের নিয়ে গবেষণায় ব্যাস্ত ছিলাম এমনটাও নয়। আসলে পুরোটাই ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা নির্ভর। অতিরিক্ত মশলা খেলে যেমন পেট গুড়গুড় করতে পারে, এবং সকলেরই করতে পারে সেটা অনুধাবন করতে গবেষণা লাগে না মাইরি। বেশি ভ্যান্তাড়া না মেরে পয়েন্টে আসা যাক।


পয়েন্টে আসছি। জাস্ট আর দু-লাইন ভ্যাঁজাবো। এই লেখায় আমি টেকনিকাল বিষয়ের সমস্যায় আসছি না। এটা কিছু নন-টেকনিকাল বিষয় নিয়ে আমার নিতান্তই ব্যাক্তিগত বক্তব্য।

১। লোকেশান সমস্যা ।।

আমাদের গল্প লিখতেই হয় এমন করে যাতে আমার চেনাশোনা এবং আয়ত্তের মধ্যে যা আছে সেখানেই গোটা ব্যাপারটা সালটে নেওয়া যায়, কিছুতেই তার বাইরে যাওয়া চলবে না। আমরা চাইলেই দিলওয়ালে দুলহনিয়ার মত নায়ক নায়িকাকে ট্রেন সিকোয়েন্স দিতে পারি না। পয়সার জোর নেই। গব্বর সিং যেভাবে পাহাড়ের ডেরায় নিজের আস্তানা জমায় আমাদের সেটা ভাবাই অন্যায়। হাস্যকর। কল্লপনার থেকেও কাল্পনিক।

গল্প লেখার সময় আমাদের বাড়ি, বন্ধুর বাড়ি, পাশের বিমল জ্যাঠুর ছাদ, খুব ভোর বেলায় স্কুলের মাঠ মোটামুটি ইত্যাদির উপর নির্ভর করে থাকতে হয়।

একটা সিন রাখব, সেলুনে ঢুকে ভিলেন একজনের গলায় ক্ষুর বসিয়ে দেবে। সুবলের সেলুনে অনেক বলে ২০০ টাকা দিয়ে ঘন্টাখানেক সময় বার করা গেল। আমাকে পুরো শট টা ঐ নির্দিষ্ট এক ঘন্টায় সেরে ফেলতে হবে। এক ঘন্টার বেশি দেরী হলে সুবলদা নিজেই আমার গলায় ক্ষুর বসিয়ে দেবে নইলে আরো ৫০০ টাকা। তাই ভুল হলে ভুলটাকে ওভারকাম করার সময় নেই। ভুলটা বুঝতে পেরেই সেটা রেখে দিতে হয়। দাদা আমি জানি ওটা ভুল। আপনি আমায় আর নতুন কি বলবেন!!!

রাজ্যস্তরের একটা ফুটবল ম্যাচ বিশ্বাসযোগ্য করে দেখানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সামান্য মূল ঘটনাটুকু দেখানোর জন্য যেটুকু আয়োজন সেটা করতেই আমার কালো মেয়ের গরীব বাবার মত কাছা খুলে যাওয়ার অবস্থা হয়। আপনি টালির চালের বাড়িতে মাংস পোলাও খাওয়ার মন নিয়ে এলে সেটা আপনার দোষ। গরীব লোকটি মাথা হেলানো ছাড়া আর কিই বা করতে পারে।


২। অভিনয়।।

কারা অভিনয় করে জানেন আমাদের ছবিতে ?? অভিনেতারা!! আপনি তাহলে কিছুই জানেন না। বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন পরিচিত পুরানো স্কুলের মাষ্টারমশাই এনাদের কাছেই করজোড়ে দাঁড়াতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য আমরা সবে দু-এক জায়গায় নিজের চাঁদপানা মুখখানা দেখিয়েছেন এমন এঁড়েপাকা মানুষজনকে অভিনয় করার কথা বলি। তবে তাদের প্যাঁনপ্যানানি শুনে আর দ্বিতীয়বার ডাকার ইচ্ছে হয় না। 'মশা কামড়াচ্ছে' / 'উফ কি গরম' / 'উফ কি শীত'। মাথা খেয়ে ফেলার জোর। ওদের বোঝানোই দায়, আমাদের কাজটা আন্তরিক, প্রোফাশনালিশম দেখানোর জায়গা এটা নয় ননীবাবু।

আমরা যাদের দিয়ে অভিনয় করাই তারা আমাদের কাছে আসে ২০ নিয়ে, আমরা ঘষে মেজে ৪৫ বানাই। বড় ডিরেক্টর বড় অভিনেতাকে নিয়ে তাদের কাঁধে ভর করে বেরিয়ে যেতে পারে, আমাদের সেই সুযোগ নেই। আমরা তবু ২০ কে নেওয়ার সাহস দেখাই, আপনি তো ৭৫-এর কম কাউকে অ্যালাউ করেন না। ঐ ৭৫ দের নেওয়ার বাজেট এবং তাদের পোঁদে তেল দেওয়া আমাদের কাজ নয়। আমরা মানুষের টাকা চোট করা কোম্পানীর পয়সায় সিনেমা বানাই না দাদা। টিফিনের টাকা জমিয়ে, পুজোয় বউকে নতুন শাড়ি না কিনে দিয়ে, নিজের জন্য নতুন ব্রান্ডের মোবাইল না কিনে সেই টাকায় হাজার বাঁধা টপকে সিনেমা বানাই। এইটুকু করতে অনেকে হেগে দিত।

৩। মিউজিক ।।

আমরা তো সিনেমা বানাই। গল্প লিখতে পারি। সিনেমা বানানোর তাগিদ থেকেই ক্যামেরা বা এডিটিংটা শিখে নিয়েছি। কারণ সেগুলো টেকনিকাল জিনিস, শিখলে নিয়মিত অভ্যাস করলে আয়ত্তে আনা যায়। কিন্তু সংগীত ?? সে তো সাধনার জিনিস। সিনেমা করব ভেবে তো আর সংগীত শেখা শুরু করা যায় না। ক্রিকেট শিখতে চাই বলে আমি ফুটবল শিখতে বা অভ্যাস করতে পারি কিন্তু জ্যোতিষচর্চা শুরু করাটা তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আজ্ঞে হ্যাঁ আমাদের মিউজিক জোগাড় করতে হয়। কারো গীটার বাজানো বন্ধুবান্ধব থাকলে কিছুটা সুবিধা হয়।

শেষ কথা

এবার আপনি বলতেই পারেন। এত সমস্যা জেনে সিনেমা করতে আসা কেন? বিছানায় শুয়ে শুয়ে গল্প লিখলেই তো হয়। তাহলে আপনাকে বলি, বেশ করব সিনেমা করব। অবিশ্বাসযোগ্য ভাবেই সিনেমা করব। আইফেল টাওয়ার-এর সিকোয়েন্স আমি শহীদ মিনারের নিচে শুটিং করব, আপনাকে ভাবতে বাধ্য করব যেটা দেখছেন সেটা সেটাই যেটা আমি বলতে চাইছি। আপনি দেখতে পাচ্ছেন না কারন আপনার কল্পনাশক্তি দুর্বল। আমার বাড়ির পাশের মাঠে আমি পলাশীর প্রান্তরে সিরাজদৌল্লাকে শুট করব, পিছনে দালান বাড়ি দেখা যাবে, আমি তবু আপনাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করব এটা পলাশী। লোকটা সিরাজ। আপনি দেখতে পাচ্ছেন না কারন আপনার চোখ তাত্ত্বিকতায় বাঁধা। কল্পনার প্রশ্রয় সেখানে নেই।


Thursday, December 11, 2014

আসুন খাদে নামি

শচীন তেন্ডুলকার কে আপনারা সকলেই চেনেন। অনেকেই এটাও জানেন যে একদিনের ম্যাচে প্রথম সেঞ্চুরীটি পেতে শচীনকে ৭৯ টি ম্যাচ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। না, এটা ক্রিকেট বা শচীনকে নিয়ে কোনো লেখা নয়। এটা খাদ নিয়েই।

কৌশিক গাঙ্গুলীকে চিনি বহু আগে থেকে যখন তিনি টেলিফিল্ম বানাতেন, সেই সময় থেকেই। এই রে, চিনি বলতে আপনি আবার এটা ভেবে বসবেন না যেন যে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। মোটেই তা নয়। চিনি মানে তার নাম জানি, তার ছবি দেখেছি। সত্যি বলছি অখাদ্য। পাতে দেওয়া যায় না। দুর্বল গল্প। দুর্বল চিত্রনাট্য। দুর্বল মেকিং।

কৌশিক গাঙ্গুলীর একটি ছবির নাম করছি। 'শূন্য এ বুকে'। হল থেকে বেরিয়ে এসে মাথা ঝিমঝিম করছিল। 'জ্যাকপট' , মানসিক অত্যাচার বললেও কম বলা হয়। 'ব্রেকফেল' ঠিকঠাক লেগেছিল। Very Frankly Speaking শুধুমাত্র পরমব্রত , স্বস্তিকা আর অনু কাপুরের জন্য। গল্প মোটেই ভালো নয়। 'আরেকটি প্রেমের গল্প' আমি দেখিনি।



'রংমিলান্তি' দেখলাম। বিশ্বাস করুন। গল্প ভালো লাগেনি। অযৌক্তিক। কিন্তু মেকিংটা অসাধারণ লাগল। বাহ। তারপর পরপর দেখলাম C/O Sir, Laptop, শব্দ। ঠুকে ঠুকে খেলা লোকটা হঠাৎ তিনিতে ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরী করে দিল। আমি তো পাগল হয়ে গেলাম। অপুর পাঁচালী দেখে আমি তো বাক্যহারা হয়েছিলাম। সীট ছেড়ে উঠতে পারিনি ১০ মিনিট। Laptop দেখে আমি অসুস্থ হয়ে গেছিলাম, কিছুতেই ঘোর কাটতে চাইত না। বেশ কিছু সিনেমায় ইতিমধ্যে লোকটির অভিনয় দেখে ফেলেছি। কলকাতায় এই মুহুর্তে কৌশিক গাঙ্গুলীর থেকে ভালো অভিনেতা নেই। আমি তো ভক্ত হয়ে গেলাম। হঠাৎ কি হল আপনার দাদা ??

আপনারা ভাবছেন, খাদ কোথায় ? আমি তো কৌশিক গাঙ্গুলীকে নিয়ে ফিরিস্তি গাইছি। আরে বাবা কে সি দাসের রসগোল্লা নিয়ে লিখতে বলা হলে আমি তো কে সি দাসকে নিয়েই আগে লিখব। রসগোল্লা নিয়ে আর নতুন কিই বা লেখার আছে, ওটা তো খাওয়ার জিনিস। আমি খাদে নেমে কি করব বলুন তো। খাদের চারপাশেই ঘোরাফেরা করি বরং।

সিনেমা শুরুই হচ্ছে বেশ কিছু এক শালিখ দেখিয়ে। আমি এই একটি ব্যাপারে বড্ড কুসংস্কারী। এক শালিখ সহ্য করতে পারি না। কিন্তু এই এক শালিখ তো আমি দেখছি না। দেখছে পর্দার মানুষ জন। কেউ একজন যখন দেশভাগের কথা বলে, ঠিক তার পরমুহুর্তেই পর্দায় ফুটে ওঠে একটি গাছের শাখা যার দুটি বৃন্তে এক গোঁছা ফুল ফুটে আছে। লিলি চক্রবর্ত্তী যখন সজ্জায় ব্যস্ত তখন আকুল নয়নে গার্গীর তাকিয়ে থাকার মধ্যে আপনি কি খুঁজে পাবেন সেটা আপনার নিজস্ব। চুপ থাকা মানুষটি যখন কথা বলে ওঠে কি বলে সেটা বুঝে নেওয়া আপনার দায়িত্ব।

কি অপুর্ব অর্থবহ দৃশ্য ভাবুন তো, জলাশয়ের মাঝে একটা পাথরের মাথা ভেসে রয়েছে, একটি নাম না জানা পাখি এদিক সেদিক করছে।

অতবড় দূর্ঘটনা হল, অথচ দেখুন কারো জামা কাপড় ছিড়ল না!! কারো জামায় ধূলোবালির দাগ নেই। আমি তো ভেবেছিলাম এত বড় ডিরেক্টরের কি করে এই সামান্য জিনিসগুলো নজর এড়িয়ে গেল?? ভুল তো আমার হয়েছিল, ভেঙ্গে গেল শেষে।

মৃত্যু তো অনিবার্য। মৃত্যুর পর জানি না কেউ কি আছে শেষে। কাকে কোথায় পৌঁছতে হবে তা কেউ জানে না। চলে যাওয়ার আগে মনের যা কিছু আবর্জনা, নোংরা খাদে ফেলে যাই। হালকা লাগবে। সত্যের চেয়ে সুন্দর তো আর কিছুই নেই।

দেখেছেন, আমি সিনেমা নিয়েই কিছুই বলতে পারলাম না। কি করে বলব বলুন তো? কষা মাংসের স্বাদ কি মুখে বলে বোঝানো যায়?? গোলাপ ফুলের গন্ধ!! অথবা এই যে আকাশ ঘিরে মেঘ করেছে, এ আমি কি করে আপনাকে শব্দে বোঝাবো?? চুমু খেতে কেমন লাগে সে কি খাতা কলমে বোঝানোর জিনিস !!!

যান , দেখে আসুন। পরিবারের সকলকে নিয়েই দেখে আসুন।


Friday, October 17, 2014

আমাদের প্রতিদিনের ঘিরে থাকা মিথ্যেরা

স্বরূপ আমার বন্ধু। পাড়াতেই থাকে। পাড়ায় দেওয়াল পত্রিকা করার সূত্র ধরে ওর সাথে ঘনিষ্টতা এবং বন্ধুত্ব। ওর হাত ধরেই নাটকের আঙ্গিনায় প্রবেশ। ছেলেটা বড় ভালো। ইমোশোনাল, গোঁয়ার, সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত। দেখতে শুনতে সেরকম ভালো নয় তবে চালাক চতুর। সমস্যা একটাই। মেয়েদের বড্ড ভয় পায়। আগ বাড়িয়ে কথা বলা তো দূর অস্ত যেখানে মেয়ে, ও তার উল্টো দিকে। আমরা বন্ধু মহলে যখন মেয়ে নিয়ে নানারকম আলোচনায় ব্যস্ত, স্বরূপ তখন ক্রমশ চলে যায় অন্য কোনো বিষয়ে। সিনেমার নায়িকাদের প্রতি তার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। বাঘা বাঘা সব নায়িকাদের সিনেমা তো দূর, সে তাদের ছবিও দেখেনি এখনও। মোদ্দা কথা হল, আমরা সকলেই জানতাম, স্বরূপ মেয়েদের নিয়ে কোনোরকম কৌতুহল দেখায় না। মেয়েদের প্রতি ওর রাগ ঘৃণা ভালোবাসা আগ্রহ কোনো কিছুই নেই।

একদিন দুজন মিলে বইমেলায় যাচ্ছি। মাঝপথে হঠাৎ কি কথা প্রসঙ্গে স্বরূপ নিজের খোলস ছাড়াতে শুরু করে। কথায় কথায় জানিয়ে দেয় তার আশেপাশের বাড়িতে যত মেয়ে রয়েছে প্রায় প্রত্যেকের সাথেই তার কখনও না কখনও শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। শুধু মেয়ে নয়, আশে পাশের বাড়ির কিছু বিবাহিত যুবতী মহিলার সাথেও তার অনেক গভীর সম্পর্ক। এই মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ আবার আমাদের কোনো কমন ফ্রেন্ডের ঘোষিত বান্ধবী। কেউ কেউ আমাদের কোনো বন্ধুর বউ। কেউ জানে না। কেউ না। আমার পায়ের তলা দিয়ে ক্রমশ মাটি সরে যাচ্ছে। এই কারণে নয় যে অনেক নারীর সাথে তার শরীরের সম্পর্ক। এরকমটা তো অনেকেরই হয়ে থাকে। মাটি সরে যাচ্ছিল এই ভেবে যে এতদিন আমরা বন্ধুরা কি ভয়ংকর মিথ্যের মধ্যে বাস করছিলাম। সেদিন সারাদিন আমি স্বরূপের সাথে বইমেলাতে ঘুরলেও আমার মন কিন্তু সেই মাঝরাস্তা থেকেই বাড়ি ফিরে এসেছিল।



তবে মিথ্যে সর্বদা এমন ভয়ংকর নয়। কখনও মিথ্যে খুব সুন্দর। নতুন শাড়ি পরে বউ সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল ‘কেমন লাগছে?’ বুকে হাত দিয়ে বলুন দেখি ক’টা পুরুষের ক্ষমতা আছে সত্যি কথা বলার। আসলে প্রশ্নকর্তা নিজেও যে মিথ্যেটাই শুনতে চাইছে। ছোট শিশুকে বাবা ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে, বলছে ‘ঘুমিয়ে পড়, কাল তোমায় খেলনা কিনে দেব’। স্বামীর হাতে প্রচুর মার খেয়েও মেয়ে তার মা-কে ফোনে বলছে ‘চিন্তা কোরো না, আমি ভালো আছি’। ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবা, বড়জোর দু-তিন মাস। ছেলে হাসপাতালে দেখা করতে এসে বলছে ‘আগামী বছর তোমায় হরিদ্বার নিয়ে যাব’। বেশ করি মিথ্যে কথা বলি। কেন বলব না? যে মিথ্যে কারো কোনো ক্ষতি করে না, সে মিথ্যে সত্যের থেকেও সুন্দর।

যে মিথ্যে কারো কোনো ক্ষতি করে না!! কলেজ থেকে বেরিয়ে সাত্যকি ফোন করল লিপিকে। দু’বার। পরপর। দুবারেই ফোন কেটে দিল। তার মানে সামনে কেউ আছে হয়ত। এরকম আগেও হয়েছে। সাথে মা থাকলে লিপি ফোন কেটে দেয়। কিছুক্ষণ পর এসএমএস এলো ‘মায়ের সাথে পিসির বাড়ি বেরাতে এসেছি। রাতে বাড়ি গিয়ে জানাবো। এর মধ্যে প্লীজ ফোন করবে না কিন্তু’। সাত্যকি প্রথমে খেলার মাঠে যায়। সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পরে। রাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখে দুটো এসএমএস। প্রথমে লিপির এসএমএস টা পড়ে – ‘পিসির বাড়ি থেকে এই মাত্র ফিরলাম। খুব টায়ার্ড। কাল সকালে ফোন করব। গুড নাইট।লাভ ইউ ফরএভার। মুহাআআআ’। দ্বিতীয় এসএমএস টা বিপ্লবের – ‘আজ সন্ধ্যেবেলায় লিপিকে দেখলাম, প্রিয়া সিনেমা হলে ইভিনিং শো দেখে বের হচ্ছিল, সঙ্গে একটা হেব্বি ছেলে ছিল ভাই। তোর সাথে কি ব্রেক-আপ হয়ে গেছে নাকি’। ঠিক এর পর সাত্যকি অনেক কিছু করতে পারে। আত্মহত্যা করতে পারে। হত্যা করতে পারে। পাগল হয়ে যেতে পারে। মিথ্যের ক্ষমতা অনেক।

অফিসের ভানুদা হাতের রুমাল মাথার উপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবাইকে বলছে ‘জানো একবার কলেজ টুর্নামেন্টে আমাদের ৮ ওভারের মধ্যে ৭ উইকেট পড়ে গেছিল। ৯নম্বরে আমি নামলাম। সবাই এতদিন পাত্তা দিত না আমায়। বাকি ১২ ওভারে তখন আমাদের দরকার ১৫৩। আমি আর প্রতাপ দুজন দুদিক সামলে ৩ বল বাকী থাকতে সেই রান তুলে নিলাম। আমি করেছিলাম নট আউট ১২৭ মাত্র ৮০ বলে। আজ থেকে ত্রিশ বছর আগের কথা বলছি। সেই সময় এইরকম মেরে খেলা কোথায় ছিল। আমাদের খেলা দেখতে এসেছিলেন কপিল দেব। আমায় ডেকে নিয়ে বললেন ইন্ডিয়া টীমে আসুন।’ সেই বছরেই বাবা হার্ট অ্যটাকটা হল। আমার আর যাওয়া হল না। অফিসের বাকিরা কিছুতেই হিসেব মিলিয়ে পারলো না। প্রায় ৪৮ বছর বয়সী একজন মানুষ তার কলেজের টুর্নামেন্টে ভালো খেলে ইন্ডিয়া টীমে যেতে পারলো না কারণ ১১ বছর আগে তার বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন বলে? মিথ্যে বুঝেও অফিসের সকলে তাকে প্রশ্রয় দিলাম। বোরিং অফিস আওয়ার্সের কিছুটা সময় এই যে ভানুবাবু রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে আর বাকি সকলে সেই রং-এ ডুবে যাচ্ছে এটা মন্দ কি।

মিথ্যে বলত ঘনাদা। মিথ্যে বলত টেনিদা। রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন ‘জগতে দুরকম পদার্থ আছে। এক হচ্ছে সত্য, আর হচ্ছেআরও সত্য। আমার কারবার আরও-সত্যকে নিয়ে’। কি এই আরও সত্য সে আর কাউকে ব্যাখ্যা করে বলে দিতে হবে না নিশ্চয়।

একটা মিথ্যে আমরা প্রায় প্রত্যেকে শুনেছি। শিয়ালদহ পার করেই ভীড় বাস ঠায় দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ। গন্তব্য হাওড়া। ভিড়ের মধ্যে কেউ চেঁচিয়ে ফোনে বলতে লাগলো ‘এই তো বাসে আছি। এসপ্লানেডে রয়েছি। দশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছি।’ ফোনটা কেটে লোকটি তার দিকে তাকিয়ে থাকা লোকদের একটু চোখ টিপে দিলেন। বাকি লোকেরাও মুচকি হেসে তাকে সমর্থন করে বুঝিয়ে দিলেন এরকম তারাও করেছেন অনেকবার।

আকাশের দিকে তাকান। দেখুন সূর্য। স্থির। আমি যদি আপনাকে বলি, ‘সূর্য স্থির নয়, পৃথিবী স্থির। সূর্য প্রতিদিন পূব থেকে পশ্চিমে তাকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে’। আপনি আমায় নিশ্চয় পাগল ভাববেন। এবং এতটাই মুর্খ ভাববেন যে কোন রকম উত্তর না দিয়েই আমায় এড়িয়ে যাবেন। আমি আপনাকে বলব পিছিয়ে যান। ২০০ / ৩০০ বছর পিছিয়ে যান। সে সময় যারা বলেছিল ‘সূর্য স্থির নয়’ তারাই সেই সময়ের প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে সঠিক বলেছিল। বিজ্ঞানের এক আবিষ্কারে সত্যের রূপ আজ পালটে গেছে। বুকে হাত দিয়ে কে বলতে পারবে আজ থেকে ৩০০ বছর পর এরকম কিছু আবিষ্কার হবে না যেটা আমাদের এই সময়কার সত্যকে মাটিতে আঁছড়ে ফেলবে।

ভাবুন তো সেই মানুষগুলোর কথা যাদের সামনে হঠাৎ চার্লস ডারুইন প্রমাণ করে দিলেন মানুষের উৎপত্তি বানর থেকে। সত্য বলা কঠিন নয়, সত্যকে হজম করা কঠিন। যে সমাজ এখনও সত্যকে সহজে হজম করতে শেখেনি সেখানে সত্য বলার আশা করাটাও অন্যায় বইকি। তাইতো আমাদের এখনও বলতে হয় ‘ভারতীয় সংস্কৃতি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ’। ‘ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ’। বলতে হয়, ‘এখানে নারীকে মাতা হিসেবে সম্মান করা হয়’। সর্বোপরি ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ’। এরকম কত মিথ্যে প্রতিদিন আমাদের বলতে হয়। আমাদের বিশ্বাস করতে হয়। করে থাকতে হয়। না থেকে উপায় বা কি!!!

এই যে মিথ্যেকে সত্য বলে বিশ্বাস করে মনে গেঁথে নেওয়া। এটাই হয়ত আশা। ‘একদিন ঝড় থেমে যাবে / পৃথিবি আবার শান্ত হবে’। এই বিখ্যাত গানের লাইনটিকে আপনি কি বলবেন? মিথ্যা?? নাকি আশা??

------- X -------

বিঃদ্রঃ এই লেখায় নেতা মন্ত্রীদের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তাদেরকে অকারণ ব্যতিব্যস্ত করতে চাইনি।

Tuesday, October 14, 2014

এরপরেও কি আপনি বলবেন 'গর্ভপাত নিপাত যাক !!!'

এতদিন গর্ভপাতকে আপনারা নিশ্চয় অন্যায় ভেবে এসেছেন?? সেটাই তো ভাবা উচিত?? আসুন এবার আমি আপনাকে একটু অন্যরকম ভাবে জিনিসটা দেখানোর চেষ্টা করি। লজিকটা বোঝার চেষ্টা করুন এবং যুক্তি নির্ভর বিরোধিতা করুন। বেকার নাকে কান্না কপচাবেন না প্লীজ।

আসলে আপনারা বড় কুঁচুটে। সব সময় একপক্ষ বা এক দিক দেখেই বিচার করে ফেলেন। বড্ড বেশি ইমোশোনাল ফেকলু। একটু দুঃখু দেখলেই চোখ টশটশ করে। সবটাই ন্যাকামো বলছি না। কিন্তু যে পাপ নিজে দিনে সাঁইত্রিশ বার করেন সেটাই অন্য কেউ করলে আহা! কি নিষ্ঠুর বলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। 'রাস্তায় মানুষটা পরে রয়েছে, আহা কেউ এসে একটু সাহায্য করছে না কেন' বলে টিভিতে বাইট দিতে পারেন কিন্তু নিজে এক পা নড়তে পারেন না।



যাই হোক, মোদ্দা কথা হল, অনিচ্ছাকৃত শিশু গর্ভে এসে গেলে অনেকেই গর্ভপাত করে থাকেন। সোজা বাংলায় যাকে Abortion বলে। অনেককেই দেখেছি এই গর্ভপাত নিয়ে খুব আঁকু-পাকু করে থাকেন।

বলা যায় না, কিছুদিন পর তারা এটাও বলতে পারেন, কনডোম পরে সেক্স করা মানে একটি 'প্রায় হয়ে যাওয়া শিশুর হত্যা' ইত্যাদি।

যে শিশুকে বাবা-মা জন্ম দিতে চাইছে না, তাকে আইনের ভয় দেখিয়ে জন্ম দেওয়া কত বিপজ্জনক সেটা ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি। জন্মানোর পর বাচ্চাটাকে কিন্তু আইন / দেশ / সমাজ কোনো শুয়োরের বাচ্চা দেখতে আসবে না। সেই বাবা মা-কেই কিন্তু এই বাচ্চার গু-মুত পরিস্কার করতে হবে। 

According to WHO, every year in the world there are an estimated 40-50 million abortions. This corresponds to approximately 125,000 abortions per day.

(Source : http://www.worldometers.info/abortions/)

ভাবুন, এই গর্ভপাত গুলি না হলে কিছু বছর পর পৃথিবীতে মানুষ দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না।

প্রতিদিন আরো ১ লক্ষ ২৫ হাজা্র
মাসে ৩৮ লক্ষ
বছরে ৪কোটি ৫০ লক্ষ

অর্থাৎ Abortion না থাকলে প্রতি বছর পৃথিবীতে ৫কোটি মানুষ অতিরিক্ত জন্ম নিত। এই নতুন জন্ম নেওয়া মানুষেরাও প্রতি ২০ বছর পর সন্তান ধারণ করত এবং তারাও Abortion না করলে না জানি আরো কত কত কোটি মানুষ সারা পৃথিবী জুড়ে পঙ্গপালের মত ঘুরে বেরাত।

এরপরেও কি আপনি বলবেন 'গর্ভপাত নিপাত যাক !!!'