সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সুখী মানুষের সেরা সময় ...

সেই চোদ্দ পনের বছর বয়সের দিনগুলো, যখন ডানাটা গজিয়েছে সবে, যখন এই চেনা বৃত্ত থেকে উড়ে বেরিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে আচ্ছন্ন এই মন। যখন খবরের কাগজে সামান্য কিছু বিজ্ঞাপন। সেই সময়টাই তো সেরা সময়, আমার সময়, সেই সময়ের গান, সেই সময়ের সিনেমা, সেই সময়ের কবিতা, সেই সময়ের রিক্সাওয়ালা, দোকানদার, কন্ডাকটার, সেই সময়ের আকাশ, সেই সময়ের বৃষ্টি, সেই সময়ের গরম, সেই সময়ের আম, সেই সময়ের ইলিশ, সেই সময়ের অষ্টমী, সেই সময়ের কালিপটকা। প্রথম সমুদ্র দেখা কিশোর ছেলেটার মুখ হা হয়ে আছে। বালির উপর প্রথমবার লিখছে নিজের নয়, নিজের প্রেমিকার নাম। সেইটাই তো সেরা সময়। ফিরতে হলে সেখানেই ফিরব।

একটাই কোনো ছাদের থেকে উড়ছে এ পাড়ার সবক’টা ঘুড়ি। ঘুড়িতে ঘুড়িতে ঢেকে যাচ্ছে আকাশ।সাদা ধবধবে কাগজে কারো হাতের লেখায় নিজের নাম। সাথে লালকালীতে করা কারুকাজ। বুকপকেটের কুঠুরীতে বহুদিন সযত্নে  তুলে রাখা ছিল সেই সম্পদ। তারপর কাগজের গুড়ো একদিন উড়ে যায় বসন্তের হাওয়ায় আহা সে কি সময় ছিল। স্কুলের টিফিনে বারান্দা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া এরোপ্লেন। জানলা দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া কাগজের নৌকো। ছুটে এসে রাস্তায় পড়ে থাকা জলের বোতলে ফুটবলের শট। ঘরের দেওয়ালে শচীনের ফটো, তাতে সঙ্কেতে লিখে রাখা কারো নাম। ডায়রীর শেষ পাতায় টুকে রাখা পাশের বাড়ির ফোন নম্বর। খবরের চ্যানেলের লোগোতে নয়, মনে মনে হিসেব রাখা পুজো আসতে আর মাত্র বাকি ১৯ দিন। বয়স যখন ১৫, অথবা ১৬, কারো কারো হয়ত ১৭। লুকিয়ে সিগারেট। দুপুরে কারো ফাঁকা বাড়িতে চাঁদা তুলে ভাড়া করে আনা ভিসিআরে পর্ণোগ্রাফি।

ছাদের কোণায় দাঁড়িয়ে লুকিয়ে দেখা বহু দূরের কোনো বাড়ির ছাদে কাপড় মেলতে আসা মেয়েটিকে। বিকেল বেলায় রেলগেটের সামনে আসতে পারবে ? তুমি এলে না। কেন এলে না? এলে দেখিয়ে দিতাম প্রেম কাকে বলে? এই যে দুপুরবেলায় একঘেঁয়ে সিরিয়ালে ডুব দিয়েছ, সত্যি করে বলো তো, খুব কি সুখে আছ? সেদিন তোমায় নিয়ে পালিয়ে যেতাম ঠিক। স্বপ্নের দেশে। আমার তখন ১৭, তোমার সামনে মাধ্যমিক। এখন মধ্যবয়সের দোরগোড়ায় স্মৃতীতে নস্টালজিক।

ঝাঁ চকচকে শপিং মলের পাশে পলেস্তারা খসা বাড়িটা আমার। জানলার গ্রীলে মরচে। মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়ামে দেওয়া গেল না। ছোট ছেলেটা বখাটে হয়েছে। বদমেজাজী স্বামী। খিটখিটে বউ। সব সুন্দরী মেয়েরা বাইকের পিছনে বসে চলে গেছে ন্যাশানাল হাইওয়ে ধরে বহুদূর। সব স্বপ্নের চাকরী বাগিয়ে নিয়েছে প্রতিবেশীরা। ফাটকা ব্যাবসায় বহু মাল কামিয়েছে দত্তবাড়ি। বেড়ার বাড়ি আজ মার্বেল বসানো। পরিবর্তনে গা ভাসিয়ে কেউ জুটিয়েছে স্কুলের শিক্ষকতা, কেউ কেউ পৌরসভার কন্ডাকটরি। বাজি লড়ে সে সময় সাইকেল নিয়ে চক্কর মেরেছিলাম বড় স্কুল মাঠে না থেমে ১০১ পাক। এখন বাজারে ঘুরে মরি সবচেয়ে সস্তার দোকান খুঁজে পেতে। বড়লোকে খরচা করে, গরীবরা হিসেব করে। রাতে খাওয়ার টেবিলে স্বামী স্ত্রী স্বপ্ন দেখে যদি হঠাৎ করে কিছু লাখ টাকা লটারী পাওয়া যায় তো কি কি করবে?

গালাগালি দিই এই সময়কে। কি আছে এখন ? আমার সময়ের মত লাল শাক নেই, বুঝলেন ফুটবল খেলে ফিরছি, গলগল  করে রক্ত পড়ছে গোড়ালি ফেটে, একটুখানি বোরোলিন লাগাতেই পাঁচ মিনিটে রক্ত পড়া বন্ধ, দু ঘন্টায় সব শুকিয়ে সাফ, এখন তো সেটাও নেই। সবেতেই ভেজাল। গোলাপে গন্ধ নেই, শাঁসওয়ালা ডাব নেই, একটু বড় সাইজের ডিমওয়ালা ট্যাংরা মাছ নেই। এই যে বর্তমান সময়কে নিন্দে, এই যে নিজের সময় নিয়ে আত্মশ্লাঘা এছাড়া আমাদের আর কি আছে ? হাত আছে তবে সেটা হাতিয়ার নয়। আমরা বোম ছুঁড়তে পারি না। চোরকে খুঁটিতে বেধে পেটাতে পারি না। কেউ পেটালে বাঁধাও দিতে পারিনা। খবরের কাগজ পড়া বন্ধ করতে পারি শুধু। নিজের রাগ মেটাতে রাতের বেলায় ফুল ফ্যামিলি মিলে এই পোড়া সময়কে তেড়ে খিস্তি করতে পারি শুধু। এই সামান্য সম্বলটুকু আমরা ছাড়ব কেন? নইলে পরেরদিন আবার সেই ভীড় বাসে ট্রেনে ধাক্কা খাওয়ার শক্তি জোগাব কি করে?



ছুটিতে সকলে মিলে বেড়াতে চলেছি পাহাড়ে। রাতের বেলায় অন্ধকার চিঁড়ে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। সকলের ঘুমের মাঝ থেকে আমি উঠে চলে এলাম চলন্ত ট্রেনের দরজায়। দমকা হাওয়া এসে লাগলো মুখে। এক লহমায় চোখের সামনে ভেসে উঠল কালো ছাতাটা। ময়দানের প্রচন্ড বৃষ্টিতে যখন সকলেই আশ্রয় নিয়েছে চায়ের দোকানের শেডের তলায়, গাছের নিচে, বাড়ির বারান্দায়। একটি ছেলে একটি মেয়ে সামান্য একটা ছাতায় ভরসা করে হেঁটে চলেছে বৃষ্টির মধ্যে। সেই বিলম্বিত চুম্বনের শেষে ছেলেটি বাসে উঠে যাবে, মেয়েটি ঢুকে যাবে মেট্রোয়। তারা দুজনে কেউ জানে না এটাই তাদের শেষ দেখা। ব্যাস্ত মোড় এক ছুট্টে পার হয়ে গেল সে। ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষন ক্যাবলার মত দাঁড়িয়ে ফিরে এলাম বাড়িতে। প্রথম দেখা মনে থাকে, শেষ দেখা রয়ে যায় চোখের জলে। আমি কতবার ফিরে গেছি সে রাস্তায়। দাঁড়িয়ে থেকেছি একা। আমি এখনও দেখতে পাই সে চলে যাওয়া। পিছন ফিরে তাকিয়েছিল কি সে? এই ঝাপসা চোখে বোঝা যায় না সঠিক। শহরে হঠাৎ বৃষ্টি নামে, তার ছাঁট এসে লাগে ট্রেনে দাঁড়ানো এক সুখী মানুষের মুখে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এরপরেও কি আপনি বলবেন 'গর্ভপাত নিপাত যাক !!!'

এতদিন গর্ভপাতকে আপনারা নিশ্চয় অন্যায় ভেবে এসেছেন?? সেটাই তো ভাবা উচিত?? আসুন এবার আমি আপনাকে একটু অন্যরকম ভাবে জিনিসটা দেখানোর চেষ্টা করি। লজিকটা বোঝার চেষ্টা করুন এবং যুক্তি নির্ভর বিরোধিতা করুন। বেকার নাকে কান্না কপচাবেন না প্লীজ। আসলে আপনারা বড় কুঁচুটে। সব সময় একপক্ষ বা এক দিক দেখেই বিচার করে ফেলেন। বড্ড বেশি ইমোশোনাল ফেকলু। একটু দুঃখু দেখলেই চোখ টশটশ করে। সবটাই ন্যাকামো বলছি না। কিন্তু যে পাপ নিজে দিনে সাঁইত্রিশ বার করেন সেটাই অন্য কেউ করলে আহা! কি নিষ্ঠুর বলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। 'রাস্তায় মানুষটা পরে রয়েছে, আহা কেউ এসে একটু সাহায্য করছে না কেন' বলে টিভিতে বাইট দিতে পারেন কিন্তু নিজে এক পা নড়তে পারেন না। যাই হোক, মোদ্দা কথা হল, অনিচ্ছাকৃত শিশু গর্ভে এসে গেলে অনেকেই গর্ভপাত করে থাকেন। সোজা বাংলায় যাকে Abortion বলে। অনেককেই দেখেছি এই গর্ভপাত নিয়ে খুব আঁকু-পাকু করে থাকেন। বলা যায় না, কিছুদিন পর তারা এটাও বলতে পারেন, কনডোম পরে সেক্স করা মানে একটি 'প্রায় হয়ে যাওয়া শিশুর হত্যা' ইত্যাদি। যে শিশুকে বাবা-মা জন্ম দিতে চাইছে না, তাকে আইনের ভয় দেখিয়ে জন্ম দেওয়া ক...

আমাদের প্রতিদিনের ঘিরে থাকা মিথ্যেরা

স্ব রূপ আমার বন্ধু। পাড়াতেই থাকে। পাড়ায় দেওয়াল পত্রিকা করার সূত্র ধরে ওর সাথে ঘনিষ্টতা এবং বন্ধুত্ব। ওর হাত ধরেই নাটকের আঙ্গিনায় প্রবেশ। ছেলেটা বড় ভালো। ইমোশোনাল, গোঁয়ার, সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত। দেখতে শুনতে সেরকম ভালো নয় তবে চালাক চতুর। সমস্যা একটাই। মেয়েদের বড্ড ভয় পায়। আগ বাড়িয়ে কথা বলা তো দূর অস্ত যেখানে মেয়ে, ও তার উল্টো দিকে। আমরা বন্ধু মহলে যখন মেয়ে নিয়ে নানারকম আলোচনায় ব্যস্ত, স্বরূপ তখন ক্রমশ চলে যায় অন্য কোনো বিষয়ে। সিনেমার নায়িকাদের প্রতি তার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। বাঘা বাঘা সব নায়িকাদের সিনেমা তো দূর, সে তাদের ছবিও দেখেনি এখনও। মোদ্দা কথা হল, আমরা সকলেই জানতাম, স্বরূপ মেয়েদের নিয়ে কোনোরকম কৌতুহল দেখায় না। মেয়েদের প্রতি ওর রাগ ঘৃণা ভালোবাসা আগ্রহ কোনো কিছুই নেই। একদিন দুজন মিলে বইমেলায় যাচ্ছি। মাঝপথে হঠাৎ কি কথা প্রসঙ্গে স্বরূপ নিজের খোলস ছাড়াতে শুরু করে। কথায় কথায় জানিয়ে দেয় তার আশেপাশের বাড়িতে যত মেয়ে রয়েছে প্রায় প্রত্যেকের সাথেই তার কখনও না কখনও শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। শুধু মেয়ে নয়, আশে পাশের বাড়ির কিছু বিবাহিত যুবতী মহিলার সাথেও তার অনেক গভীর সম্পর্ক। এই মেয়েদের মধ্...

আসুন খাদে নামি

শচীন তেন্ডুলকার কে আপনারা সকলেই চেনেন। অনেকেই এটাও জানেন যে একদিনের ম্যাচে প্রথম সেঞ্চুরীটি পেতে শচীনকে ৭৯ টি ম্যাচ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। না, এটা ক্রিকেট বা শচীনকে নিয়ে কোনো লেখা নয়। এটা খাদ নিয়েই। কৌশিক গাঙ্গুলীকে চিনি বহু আগে থেকে যখন তিনি টেলিফিল্ম বানাতেন, সেই সময় থেকেই। এই রে, চিনি বলতে আপনি আবার এটা ভেবে বসবেন না যেন যে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। মোটেই তা নয়। চিনি মানে তার নাম জানি, তার ছবি দেখেছি। সত্যি বলছি অখাদ্য। পাতে দেওয়া যায় না। দুর্বল গল্প। দুর্বল চিত্রনাট্য। দুর্বল মেকিং। কৌশিক গাঙ্গুলীর একটি ছবির নাম করছি। 'শূন্য এ বুকে'। হল থেকে বেরিয়ে এসে মাথা ঝিমঝিম করছিল। 'জ্যাকপট' , মানসিক অত্যাচার বললেও কম বলা হয়। 'ব্রেকফেল' ঠিকঠাক লেগেছিল। Very Frankly Speaking শুধুমাত্র পরমব্রত , স্বস্তিকা আর অনু কাপুরের জন্য। গল্প মোটেই ভালো নয়। 'আরেকটি প্রেমের গল্প' আমি দেখিনি। 'রংমিলান্তি' দেখলাম। বিশ্বাস করুন। গল্প ভালো লাগেনি। অযৌক্তিক। কিন্তু মেকিংটা অসাধারণ লাগল। বাহ। তারপর পরপর দেখলাম C/O Sir, Laptop, শব্দ। ঠুকে ঠুকে খেলা লোকটা হঠাৎ তিনিতে ব্যা...